এটা কার জন্য উপযোগী?

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিশেষ করে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তাদের পরিচর্যাকারী ও অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি

প্রকাশের তারিখ
জুন 2026
তৈরি করা হয়েছে
ন্যাশনাল রিসোর্স সেন্টার অন ডেফব্লাইন্ডনেস- এনআরসিডিবি, সিডিডি।

প্রতি বছর ২৭ জুন আন্তর্জাতিক শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা দিবস পালিত হয়। দিনটি হেলেন কেলার দিবস (Helen Keller Day) নামেও পরিচিত।  

এই রিসোর্সে দিবসটির ইতিহাস, এটি কীভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং এই স্বীকৃতি বিশ্বব্যাপী শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কী তাৎপর্য বহন করে, তা তুলে ধরা হয়েছে।।

পটভূমি (Background)

১৯৮০ সাল থেকে ২৭ জুন ‘হেলেন কেলার দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিনটি শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী লেখক, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মী হেলেন কেলার (১৮৮০–১৯৬৮)-এর জন্মদিনকে স্মরণ করে পালিত হয়। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা বিশ্বজুড়ে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০২৫ সালের জুন মাসে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ২৭ জুনকে আন্তর্জাতিক শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি অর্জিত হয় জাতিসংঘে ক্রোয়েশিয়া প্রজাতন্ত্রের স্থায়ী মিশন এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব দ্য ডেফব্লাইন্ড (World Federation of the Deafblind – WFDB)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি বৈশ্বিক প্রচারণার মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে ছিলেন ড. সানজা তারচাই (Dr. Sanja Tarczay)।

এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, অবদান ও অর্জন উদযাপন করে। একই সঙ্গে, তারা যে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন সে সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রতি বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়।

হেলেন কেলার কে ছিলেন? (Who was Helen Keller)

হেলেন কেলার ছিলেন একজন অগ্রণী লেখক, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মী, যিনি শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও তাঁর অসাধারণ জীবন ও কর্মের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন।

তিনি ১৮৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র দুই বছর বয়সে এক ধরনের অসুস্থতার কারণে তিনি দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হারান। পরবর্তী সময়ে তিনি পারকিন্স স্কুল ফর দ্য ব্লাইন্ড (Perkins School for the Blind)-এ অধ্যয়ন করেন, যেখানে তাঁর শিক্ষিকা অ্যান সুলিভান (Anne Sullivan) স্পর্শ যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁকে শেখান। এরপর তিনি ব্রেইল, ইশারা ভাষা (Sign Language) ও কথা বলার মাধ্যমে যোগাযোগ শেখেন।

হেলেন কেলার ছিলেন বিশ্বের প্রথম শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ মানবতাবাদী হিসেবে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বের সকল সরকার প্রধানকে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সহায়তামূলক কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান।

তাঁর উত্তরাধিকার হলো শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য তাঁর আজীবনের সংগ্রাম। তিনি প্রবেশগম্যতা (Accessibility), অন্তর্ভুক্তি (Inclusion) এবং সামাজিক স্বীকৃতি (Recognition) নিশ্চিত করার পক্ষে কাজ করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, যথাযথ সুযোগ ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা হলে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারেন।

“একা আমরা খুব অল্পই করতে পারি; একসঙ্গে আমরা অনেক কিছুই করতে পারি।”
— হেলেন কেলার

স্বীকৃতি (Recognition)

১৬ জুন, ২০২৫ তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (United Nations General Assembly – UNGA) আনুষ্ঠানিকভাবে ২৭ জুনকে আন্তর্জাতিক শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

এই ঐতিহাসিক অর্জন সম্ভব হয়েছে জাতিসংঘে ক্রোয়েশিয়া প্রজাতন্ত্রের স্থায়ী মিশনের নেতৃত্বে, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব দ্য ডেফব্লাইন্ড (WFDB)-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় এবং ড. সানজা তারচাই-এর দিকনির্দেশনায়। ড. তারচাই নিজেও একজন শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আন্দোলনের একজন সুপরিচিত আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব। এই উদ্যোগে মূল সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে ছিল অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, জিবুতি, জর্ডান ও তানজানিয়ার যুক্ত প্রজাতন্ত্র।

জাতিসংঘে এই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন ক্রোয়েশিয়ার উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি মি. হ্রভোয়ে চুরিচ হ্রভাতিনিচ (Hrvoje Ćurić Hrvatinić)। তিনি বলেন, এই প্রস্তাবটি হলো,

‘শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন আর কখনও উন্নয়নের মূলধারা থেকে পিছিয়ে না পড়েন সে বিষয়টি নিশ্চিত করার একটি কার্যকর আহ্বান’

বিশ্বের ৯৯টি দেশ এই প্রস্তাবের সহ-উদ্যোক্তা (Co-sponsor) হিসেবে সমর্থন প্রদান করে, যা শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক ঐক্যমতের প্রতিফলন।

এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ (Why it matters)

আন্তর্জাতিক শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা দিবস শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতাকে একটি স্বতন্ত্র প্রতিবন্ধিতা (Distinct Disability) হিসেবে বৈশ্বিকভাবে তুলে ধরে, যা শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের অনেক দেশে এখনও শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতাকে পৃথক একটি প্রতিবন্ধিতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এর ফলে আইন, নীতিমালা, সেবা প্রদান এবং তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। বর্তমানে অনেক ব্যক্তি কেবল শ্রবণ প্রতিবন্ধী অথবা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃত হন, যার কারণে তারা তাদের বিশেষ চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।

যদিও কেবল আইনগত স্বীকৃতি অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে না, তবুও এটি সামাজিক সচেতনতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়ন এবং প্রয়োজনভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করার মৌলিক ভিত্তি তৈরি করে। এই স্বীকৃতি না থাকলে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নীতিনির্ধারণ, পরিসংখ্যান এবং সেবা ব্যবস্থায় অবহেলিত, অপর্যাপ্তভাবে প্রতিনিধিত্বশীল এবং কার্যত অদৃশ্য রয়ে যেতে পারেন।

জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা দিবস ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। এটি রাষ্ট্রসমূহকে আইন, নীতিমালা ও কর্মসূচিতে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানায় এবং অ্যাডভোকেসির বৈশ্বিক উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বব্যাপী শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে আরও জোরালো করে এবং সম্মিলিত উদ্যোগের শক্তিকে তুলে ধরে।

এর তাৎপর্য কী? (What does it mean)

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আন্দোলনের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক বিশ্বজুড়ে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নীতিগত অগ্রাধিকারে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থানসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা, অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নের পথ সুগম হবে। সচেতনতা থেকেই পরিবর্তনের সূচনা হয়। আর সেই সচেতনতাই আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রথম ধাপ।

ডাউনলোড

এটা কি কার্যকরী ছিলো?

এটা কি কার্যকরী ছিলো?

শেয়ার


একই রকম রিসোর্স

শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুর উপযোগী শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ তৈরি

এই রিসোর্সে মূলত কীভাবে শ্রেণিকক্ষে শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুর উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা যায় সে সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

নৈঃশব্দ থেকে কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা

এই রিসোর্সটি মূলত শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি যুব নেটওয়ার্ক দল, তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য দিয়ে থাকে।

বাড়িভিত্তিক শিক্ষা: একীভূত শিক্ষার পাথেয়

এই রিসোর্সটি মূলত গুরুতর ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী শিশুদের বাড়িভিত্তিক শিক্ষা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে থাকে।